করোনা সময়ের পরম বন্ধু চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা

মাহবুব নূর

নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন আমাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। শত প্রতিকূলতা জয় করে তারা করোনা আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে চলছেন। কিন্তু তারা খুব বেশি নিরাপত্তা পাননি শুরুতে। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে অনেকটা নিরাপত্তার সুরক্ষা হয়।

বলা যায়, সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থকর্মীসহ চিকিৎসকদের প্রস্তুত করতে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধতাও আছে। আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এমন জটিলতায় খবর বেরোয় চিকিৎসক-নার্সদের সরবরাহ করা মাস্ক নিম্নমানের। তাদের শতভাগ সুরক্ষিত পারসনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুয়িপমেন্ট (পিপিই) দেওয়া হয়নি। অথচ তাদেরই সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল সবার আগে।

এমন ক্ষণে অনেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করছেন। অনেকে তার পদত্যাগও চান। এদিকে দেশে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে চিকিৎসক-নার্সদের আক্রান্তের হারও। ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটিম রাইট অ্যান্ড রেসপন্সসিবিলিটি (এফডিএসআর) শুক্রবার গণমাধ্যমকে জানায়, দেশে বর্তমানে করোনা আক্রান্ত চিকিৎসক ৩০৪ জন, নার্স ১৯০ জন। সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক ডা. রাহাত আনোয়ার চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী করোনা আক্রান্ত চিকিৎসকদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৪৬, ময়মনসিংহ বিভাগে ২২, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩, খুলনা বিভাগে আট, বরিশাল বিভাগে আট, সিলেট বিভাগে চার এবং রংপুর বিভাগে তিন জন রয়েছেন।’ এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯০ জন নার্স করোনা আক্রান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আক্রান্তদের মধ্যে ১১৪ জন নার্স সরকারি ও ৭৬ জন নার্স বেসরকারি হাসপাতালের।’ এ ছাড়া, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আয়া ও টেকনিশিয়ানসহ অন্যান্য মেডিকেল স্টাফ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন বলেও জানান ডা. রাহাত।

এমন খবরের সঙ্গে আরো কিছু খবর বেরোয় যা নিতান্ত কষ্টের। করোনা সংক্রমণের ভয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলাশহরে অনেক বাড়িওয়ালা চিকিৎসক-নার্সদের বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেন। ইতোমধ্যে সরকার, আদালত, দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় বাড়িওয়ালাদের অপতৎপরতা বন্ধ হয়।
এদিকে করোনা মোকাবেলায় অব্যবস্থাপনার কথা জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘যথাযথ নিরাপত্তাসামগ্রী ছাড়াই প্রথম দিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সেবা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।’ অধ্যাপক ডা. নজরুল বলেন, ‘পরে তাদের কাছে যেসব সামগ্রী গেছে তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের।’ তিনি আরো বলেন, ‘এন-৯৫ মাস্কের নামে তাদের যেটা দেওয়া হচ্ছে সেটা অত্যন্ত নিম্নমানের।’

এর মাঝেই করোনা রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈনউদ্দিন আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এ বীর কোভিডযোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসা দিতে ঢাকায় আনতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চেয়েও পাওয়া যায়নি। অবশ্য পরে খুলনা থেকে করোনা আক্রান্ত এক চিকিৎসককে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনা হয়। আসলে আমাদের দেরিতে বোধোদয় হয়।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অনেকেই অভিযোগ করছেন, এখনো হাসপাতালগুলোতে যারা সরাসরি চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তাদের কাছে উপযুক্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এ স্বাস্থ্য বিভাগের যুগ-যুগের অব্যবস্থাপনার ফসল।

এসবের মাঝেও করোনা আক্রান্ত রোগীকে সেবা ও চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ্য করে তুলছেন চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা। ফলে দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়াদের সংখ্যাটি বড়ই।

স্বভাবতই চিকিৎসক-নার্সদের প্রশংসা করেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। তিনি স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনায় বেশি আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসেবে বলেন, ‘স্বাস্থ্যকর্মীরা ভালো সেবা দিচ্ছেন; নিজেদের জীবন বাজি রেখে চিকিৎসা দিচ্ছেন; ফলে আক্রান্তও হচ্ছেন বেশি।’ চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি দেখভাল করছেন। ফলে এখন তারা এসব পাচ্ছেন।’
অন্যদিকে শুরুতে করোনা মোকাবেলায় গলদ ছিল জানিয়ে সরকারপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সেনাল বলেন, ‘আমাদের যারা ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে আছেন তারা মনে করেছিলেন, ডেঙ্গুর মতো করোনা পরিস্থিতিও সামাল দিয়ে ফেলবেন। শুরুতে তাই কিছু না করেই শুধু ফাঁকা বুলি আউড়িয়ে গেছেন তারা। যখন আক্রান্ত ধরা পড়ল তখনো শুধু মনোবল দিয়েই চিকিৎসকদের মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।’

এমনসব কষ্টের কথা শেষে স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের প্রতি সহমর্মীতা জানিয়ে বলছি, আমরা চাই করোনার ছোবল থেকে আপনারা নিরাপদ থাকুন। আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকরা সুস্থ হয়ে আবারো করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত হোন।

সরকারের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের বলছি, প্রধানমন্ত্রীর কথার গুরুত্ব দিন। সবার আগে চিকিৎসক-নার্সদের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন। করোনাকে পুঁজি করবেন না।

লেখক : চিকিৎসক।