ঝুঁকিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা

আহরার সজীব

মালিবাগের একটি গলি। প্রথম রমজানের ভোরবেলা। ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করছেন একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তার মুখে নামমাত্র একটি মাস্ক। যা ধুলি রক্ষা ছাড়া কোনো সুরক্ষা দেবে না। পাশেই একটি হাসপাতাল। তার বর্জও গলিতেই ফেলে রাখা। এসবও পরিষ্কার করছেন ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

বলা যায় এ অতি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। করোনা যেখানে সারাবিশ্বে মহামারি রূপে আভির্ভুত; সেখানে সুরক্ষিত হওয়া ছাড়া ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ময়লা পরিষ্কার করা ঝুঁকিরই। আরো যেখানে পাশের হাসপাতাল থেকে বর্জ্য ফেলা হয়েছে।

কষ্টের কথা রাজধানীতে এমন বারো হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন। তাদের মধ্যে প্রায় আট হাজার নিয়মিত ও চার হাজার অনিয়মিত। কোনো ধরনের মাস্ক, গ্লাভস ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই তারা বাসাবাড়ি থেকে ময়লা অপসারণের কাজ করছেন। অবশ্য সিটি করপোরেশন তাদের দায় খুব একটা নিচ্ছে না।

এর মাঝেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) অনুমোদিত ময়লা অপসারণ কাজে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভ্যানশ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বেশ কয়েকজনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা দক্ষিণে ৫ হাজার ২৪০ ও উত্তরে ২ হাজার ৭০০ জন নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন। এর বাইরে দুই সিটিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রায় চার হাজার অনিয়মিত কর্মী কাজ করছেন। বাসাবাড়ির ময়লা অপসারণে বিভিন্ন সামাজিক, বেসরকারি সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ের ঠিকাদারদের অনুমোদন রয়েছে। তারা ময়লা অপসারণের জন্য প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে। এজন্য নিজস্ব কর্মী নিয়োগ দেয়। কিন্তু করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনা করে ঠিকাদাররা কর্মীদের সুরক্ষা দিচ্ছেন না। ফলে কর্মীরা খালি হাতে ময়লা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এক বাসার ময়লা রাখার ঝুড়ি ও বালতির ছাপ পড়ছে আরেক বাসায়। এতে বাসিন্দাদের মধ্যে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ছে।
কিছু মন্তব্য পড়লে পাঠক বিষয়টি ধরতে সুবিধা হবে-
কলাবাগান বশীর উদ্দিন রোড এলাকায় ময়লা অপসারণকারী ভ্যানের চালক আবদুল হক বলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া আমাদের রক্ষার কেউ নেই। একটি মাস্ক ১০-৩০ ও গ্লাভস কিনতে ১০ টাকা লাগে। প্রত্যেক দিন এ বাড়তি টাকা কোথায় পাব? মালিককে বলেছি, কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি।’

নয়াপল্টন এলাকার বাবু বলেন, ‘আমার কোনো নিরাপত্তা নেই। আমার মাধ্যমে অন্যরা আক্রান্ত হতে পারে, সেটি কেউ বুঝতে চায় না। কিছুদিন আগে এক জোড়া হাতমোজা দেওয়া হয়, চার দিনেই নষ্ট হয়ে গেছে। এখন খালি হাতেই সব কাজ করছি।’

বসুন্ধরায় কামাল নামের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, ‘করোনাভাইরাস রোধে মালিক আমাদের কোনো কিছু দেননি। ব্যক্তিগতভাবে মাস্ক কিনেছি। কিন্তু কাজের সময় অনেক ঝামেলা মনে হয়। মাঝে মাঝে মাস্ক পরি, তবে হ্যান্ডগ্লাভস নেই।’

বশীর উদ্দিন রোড এলাকার ঠিকাদার মুকুল মিয়া বলেন, ‘আমার অধীনে দুটি ভ্যানে চারজন কর্মী কাজ করেন। তাদের সিটি করপোরেশন থেকে দুই জোড়া করে হাতমোজা ও এক জোড়া করে মাস্ক দেওয়া হয়েছে। আমি নিজেও এক জোড়া করে মাস্ক ও গ্লাভস কিনে দিয়েছি।’

বারিধারা এলাকার একটি বাড়ির মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমার বাসায় যারা ভ্যান গাড়ি দিয়ের ময়লা নেন, তারা কেউ মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভস ব্যবহার করেন না। আমি মনে করি এসব পরিচ্ছন্নকর্মীদের মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভস ব্যবহার করা খুবই জরুরি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‘যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ময়লা নেন, তাদের সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের। তারা সিটি করপোরেশনের কর্মী নন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব কর্মীর জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব কর্মী না হওয়া সত্ত্বেও দুই হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সংক্রমণ ঠেকাতে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের রাস্তায় জীবাণুনাশক ছিটানো হচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখার কাজ চলছে।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পরিচ্ছন্নকর্মীদের অবশ্যই ময়লা সংগ্রহের সময় হ্যান্ডগ্লাভস ও মাস্ক পরতে হবে। অন্যথায় তারা যে বাড়ি থেকে ময়লা নেবে সে বাড়ির ময়লা থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে।’

বলা যায় করোনা মোকাবেলায় সচেতনতার চিত্র নয় এসব। খেটে খাওয়া গরীব এসব পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়া উচিত সিটি করপোরেশনসহ বেসরকারি ঠিকাদারদের। না হয় করোনা সংকট দীর্ঘায়িত হবে।

তবে এসব নিয়েও প্রতিদিন নাগরিক জঞ্জাল পরিষ্কার করছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। আমরা দেদার নোংরা নগরকে রাত শেষে পরিচ্ছন্ন পাই তাদের জন্যই। কোনো ভোরবেলা নাগরিক জীবনে দেখেছেন কি তারা কতটা পরিশ্রম করেন নগরকে পরিষ্কার করতে। না দেখে থাকলে একদিন ঘুম থেকে উঠে পড়েন আগে আগে। হয়তো তাদের সঙ্গে আপনার দেখা হয়ে যেতেও পারে। তখন বুঝতে পারবেন তাদের কষ্ট। নিতান্ত পেটের দায়ে তারা নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখেন। সহজ-সাধারণ সময়ে কাজটি যথেষ্ট কঠিন। এবার করোনাকালে এটি আরো কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।

এমন ক্ষণে কথা আসে, একজন গরীব পরিচ্ছন্নতাকর্মী যদি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার দায় নেবে কে? তার শত ভরসার পরিবারের ভবিষ্যৎ কী হবে?
তবু তারা করোনাকালের সহায়ক। করোনার নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখার অগ্রনায়ক। এভাবে তারা করোনা মোকাবেলার বড় অংশ হয়ে যান।

লেখক : ঢাকার অধিবাসী।