এমন সময় বিভেদ থাকতে নেই

রায়হান উল্লাহ

দেশে করোনাকাল চলছে। ক্ষুদ্র একটি ভাইরাসের কাছে জিম্মি আমরা। ক্রমশ বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। দেশে সাধারণ ছুটিও চলছে। সব ধরণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

এর মাঝেও কথা থাকে। আমরা সবকিছু মানছি না। না মেনে আমরা আসলে নিজেরই ক্ষতি করছি। দেশকে যদি আমরা মা ভাবি; তবে মা আক্রান্ত। দেশ কিন্তু মাই। এমন ক্ষণে দেশের প্রতিটি নাগরিক ভাই-ভাই। তাদের মধ্যে বিভেদ থাকার কথা না। কিন্তু আমরা বিভেদ দেখি।
যখন আমি-আপনি আইনের তোয়াক্কা ও ভালোর চিন্তা না করে শুধু নিজের লাভ ভাবি; তখন বিভেদ আছে বলেই ধরে নিতে হয়। যখন জনপ্রতিনিধি চাল চুরি করেন; তখন বিভেদ আছে বলেই প্রমাণিত হয়।

একবার ভাবুন এই করোনাকালে আপনার করণীয় কি? প্রথমেই করণীয় আপনিক সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করবেন। তা করছেন কি? আরো করণীয় আপনার সামর্থ অনুযায়ী দান করবেন। তাও কি করছি আমরা?

এমন অনেক করণীয় আছে। কিছুই করছি না আমরা। আমরা দলবেধে হল্লা করছি; করোনা ছড়াক দেশে তাতে আমার কী যায় আসে? সবকিছু আমাদের কাছে ময়লা ঝাড়ার মতো বিষয়। ময়লা দূরবর্তী পড়লেই হলো। অন্য একজন এমন ভেবে ময়লা আমার দিকেও ফেলছেন; ভাবনা খেলে না আমাদের!

আমরা লকডাউন মানি না। সেনা-পুলিশ-সরকার মানি না। আসলে আমরা নিজের ভালোটাই মানি না।

আমাদের বিদেশি ভাইটি দেশের প্রতি ভালোবাসা কাকে বলে জানেন না! অবশ্য একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক হিসেবেই তিনি প্রবাস জীবন কাটিয়ে এসেছেন। দেশে এসে তার কী যেন হয়েছে?

একজন নাগরিক হিসেবে করোনাকালে আপনার করণীয় কী- এমন প্রশ্ন রেখেছেন নিজের প্রতি? তখন অনেক ভাবনা খেলা করবে। করোনাকালে আপনার কর্তব্য হওয়া উচিত নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। তাও কি পুরোপুরি করছেন আপনি? পরক্ষণে আপনার কর্তব্য কিংবা দায়িত্ব হওয়া উচিত দেশের মঙ্গল কামনা। তা কি করছেন আপনি? যদি আপনার গোপন মনে দেশপ্রেম থাকে তবে সব ভালো হবে। বাকি সব মঙ্গলময় বিষয় আপনার ব্রেন করিয়ে নেবে।

তাই যদি হতো তবে এত কথা আসত না। করোনার এ সময়ে আমরা খুব বেশি দেশকে ভালোবাসতে শিখিনি। শিখলে কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাগত না। আর একটি সরকার সব নাগরিকের সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে না; গতিবিধিও।

আপনি মনে করেন দেশে কোনো সরকার নেই; দেশ আক্রান্ত। আপনি কী দেশপ্রেমের পরিচয় দেবেন না? যদি দেন তবে এটি ভিন্ন একাত্তর। করোনার রণাঙ্গণে ঝাপিয়ে পড়ার সময় আপনার।

অথচ আমরা দেখি আমাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নামাতে হয়। আমরা করোনার সময়ে নিজের লাভ খুঁজি। ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন, চিকিৎসকদের সরবরাহ করেন নকল পিপিই। মাস্ক পড়ে আমরা হরহামেশা সারাদেশ ঘুরি, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। অথচ আমাদের চারপাশে করোনা নামের জীবাণু। আরেকটু এগিয়ে আমার-আপনার পরিহিত মাস্কটি নকল। ভয় লাগছে না? লাগার কথা এবং বাকিটা সময় নিজের ও দেশের কল্যাণে জীবাণুটি থেকে নিজেকে-মানুষকে-দেশকে সুরক্ষার জন্য সব করার কথা।
কিন্তু কই? যে ব্যবসায়ী এখন সবকিছুতে ফায়দা লুটছেন তিনি কি দেশকে মা ভেবেছেন? যে আমলাটি এখন করোনাকালেও সহায়ক হতে পারেননি দেশের তাকে কি দেশের প্রেমী কেউ ভাববেন? আমার বরং তাকে দেশের শত্রু মনে হয়। ঠিক যেন একাত্তরের রাজাকারটির মতো।
এমন অনেক কথা আসে করোনাকালে। আসে আরো অনেককিছু। আমরা যদি দেশপ্রেমিক হই তবে গুজব রটাই কীভাবে? আমরা যদি মা আক্রান্ত হয়েছে ভাবি তবে বিজ্ঞানী বিজন ও কোভিডযোদ্ধা ডা. মঈনকে নিতে সমস্যা কোথায়?

এমন অনেক বিচ্যুতি ঘটাচ্ছি আমরা যাতে সহজেই বলা যায় আমাদের দেশপ্রেমে ঘাটতি আছে। চলুন ঘাটতি দূর করি। ভাইয়ে-ভাইয়ে বিভেদ আপাত দূরে ফেলে দেই। এখন সময় যুদ্ধে যাওয়ার। নভেল করোনাভাইরাস (কেভিড-১৯) নামের অতিক্ষুদ্র জীবাণুকে দেশ থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করার। মাকে ভালোবেসে মায়ের হওয়ার। বাংলাদেশ নামের অপরূপ বদ্বীপ ভূখ-টি আমার-আপনার মা। মা করোনার ছোবলে। প্রাণ না যাওয়ার আগে একটু সাবধান হই।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক।